কম্পিউটার নেটওয়ার্ক কি? এর প্রকারভেদ, টপোলজি ও ডিভাইস

নেটওয়ার্ক শব্দটির সাথে আমরা প্রায় সবাই পরিচিত। বর্তমানে হয়ত অজোপাড়া গাঁয়ের যেকোনো লোকই নেটওয়ার্ক কি তা বলতে পারবে। আজ আমরা জানবো কম্পিউটার নেটওয়ার্ক কাকে বলে কত প্রকার ও কি কি, টপোলজি কত প্রকার এবং কম্পিউটার নেটওয়ার্ক নেটওয়ার্ক তৈরির জন্য ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি বা ডিভাইস সম্পর্কে।

কম্পিউটার নেটওয়ার্ক কি

দুই বা ততোধিক কম্পিউটারকে কোনো উপায় ব্যবহার করে যুক্ত করে দিলে তাকে কম্পিউটার নেটওয়ার্ক(Computer Network) বলে। এর ফলে একটি কম্পিউটার থেকে অন্য কম্পিউটারে তথ্য আদান-প্রদান ( Data Transfer ) করা যায়। এই নেটওয়ার্ক সাধারণত অনেকগুলো কম্পিউটারের সমষ্টি। এইযে আমরা ইন্টারনেট ব্যবহার করছি এটি মূলত কম্পিউটার নেটওয়ার্ক এর মাধ্যমেই কাজ করছে। তবে এই কম্পিউটার নেটওয়ার্ক তৈরি করার জন্য অনেক ডিভাইস প্রয়োজন হয়।কম্পিউটার নেটওয়ার্ক গঠন করতে যা প্রয়োজন হয় তাকে নেটওয়ার্ক টুলস বা যন্ত্রপাতি কিংবা ডিভাইস বলা হয়। এই ছাড়াও কম্পিউটার নেটওয়ার্কের কিছু টার্ম বা কিওয়ার্ড আছে। সার্ভার, ক্লায়েন্ট, মিডিয়া, নেটওয়ার্ক এডাপ্টার, রিসোর্স, ইউজার, প্রটোকল ইত্যাদি দ্বারা কম্পিউটার নেটওয়ার্ক গঠিত হয়।

কম্পিউটার নেটওয়ার্ক কত প্রকার ও কি কি

কম্পিউটার নেটওয়ার্ককে সাধারণত ৪ ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-

  • PAN (Personal Area Network)
  • LAN (Local Area Network )
  • MAN (Metropolitan Area Network )
  • WAN (Wide Area Network)

1. PAN কিঃ ব্যক্তিগত পর্যায় যে নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয় তাকে Personal Area Network বা PAN বলা হয়। পারসোনাল এরিয়া নেটওয়ার্ক এর মাধ্যমে সাধারণত দুটি কম্পিউটারের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ স্থাপন করা হয়। ক্যাবল বা তার অথবা ব্লু-টুথ এর মাধ্যমে PAN(প্যান) তৈরি করা হয়।

2. LAN কিঃ Local Area Network কে সংক্ষেপে ল্যান (LAN) বলা হয় । একই বিল্ডিং এর মাঝে কয়েকটি কম্পিউটার নিয়ে যে নেটওয়ার্ক গঠিত হয় তাকে লোকাল এরিয়া নেটওয়ার্ক (Local Area Network) বলে। এই ধরনের নেটওয়ার্ক গঠন করা খুব সহজ। এতে ব্যবহৃত ডিভাইস সমুহের দাম খুব কম । LAN নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত ডিভাইস সমুহ হল হাব, সুইচ , রিপিটার । বর্তমানে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংক, ছোট-মাঝারি অফিস-আদালত ও ব্যবসা-বাণিজ্যে লোকাল এরিয়া নেটওয়ার্ক বা LAN ই ব্যবহার করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য থাকে ডিভাইসসমূহের পরস্পরের মধ্যে তথ্য-উপাত্ত এবং রিসোর্স শেয়ার করা।

3. MAN কিঃ মেট্রোপলিটান এরিয়া নেটওয়ার্ক (Metropolitan Area Network), একে সংক্ষেপে ম্যান (MAN) বলা হয় । একই শহরের মধ্যে অবস্থিত কয়েকটি ল্যানের সমন্বয়ে গঠিত নেটওয়ার্ককে বলা হয় মেট্রোপলিটন এরিয়া নেটওয়ার্ক (MAN)। এ নেটওয়ার্ক ৫০-৭৫ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। এর ডাটা ট্রান্সফার স্পিড গিগাবিট পার সেকেন্ড হতে পারে। এ ধরনের নেটওয়ার্ক এ ব্যবহৃত ডিভাইসগুলো হলো রাউটার, সুইজ, মাইক্রোওয়েভ এন্টেনা ইত্যাদি।

4. WAN কিঃ ওয়াইড এরিয়া নেটওয়ার্ক (Wide Area Network), একে সংক্ষেপে ওয়্যান (WAN) বলা হয় । দূরবর্তী ল্যানসমূকে নিয়ে যে নেটওয়ার্ক গড়ে উঠে তাকে ওয়াইড এরিয়া নেটওয়ার্ক বলে। সাধারণত দেশের মধ্যে অথবা পৃথিবী জুড়ে এই ধরনের নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়।

নেটওয়ার্ক টপোলজি কি? কত প্রকার ও কি কি

কম্পিউটারগুলোর মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এই ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিকে নেটওয়ার্ক টপোলজি(Network Topology) বলা হয়। নেটওয়ার্ক এর ফিজিক্যাল লেআউট(Layout) হলো টপোলজি। টপোলজি অনেক প্রকার হলেও কম্পিউটার নেটওয়ার্ক এ টপোলজি সাধারণত ৬ প্রকার।

  1. বাস টপোলজিঃ একটি মূল ব্যাকবোন বা মূল লাইনের সাথে কম্পিউটারগুলোকে জুড়ে দেওয়া হলে তাকে বাস টপোলজি বলে। দেখতে বাস এর মতো বলে এর নাম বাস টপোলজি ( Bus Topology)। এই পদ্ধতিতে একটি কম্পিউটার নষ্ট হলেও অন্য কম্পিউটারে নেটওয়ার্ক ব্যবস্থায় সমস্যা হয় না। তবে মূল ব্যাকবোন(backbone) নষ্ট হলে পুরো নেটওয়ার্ক অচল হয়ে যায়।
  2. রিং টপোলজিঃ এই পদ্ধতি দেখতে গোলাকার বৃত্তের মতো বলে এর নাম রিং টপোলজি(Ring Topology)। এখানে প্রত্যেকটা কম্পিউটার অন্য দুইটি কম্পিউটারের সাথে যুক্ত থাকে। এই ক্ষেত্রে একটি কম্পিউটার নষ্ট হলে হলে সম্পূর্ণ নেটওয়ার্ক অচল হয়ে যায়।
  3. স্টার টপোলজিঃ স্টার বা তারার মতো দেখতে বলে এর নাম হয়েছে স্টার টপোলজি। যখন সবগুলো কম্পিউটার কেন্দ্রীয় হাব(Hub)/সুইচ(Switch) এর সাথে যুক্ত থাকে তখন তাকে স্টার টপোলজি (Star Topology) বলে। এক্ষেত্রে একটি নষ্ট হলেও নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা সচল থাকে। কিন্তু কেন্দ্রীয় হাব/সুইচ খারাপ হলে সম্পূর্ণ নেটওয়ার্ক বিকল হয়ে যায়।
  4. ট্রি টপোলজিঃ দেখতে গাছের শাখা-প্রশাখার মত হয় বলে এর নাম ট্রি টপোলজি (Tree Topology)। অনেকগুলো স্টার টপোলজি এর সমন্বয় ট্রি টপোলজি তৈরি করা হয়। অফিস বা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে এই পদ্ধতি বেশি ব্যবহার করা হয়।
  5. হাইব্রিড টপোলজিঃ বাস, স্টার, রিং ইত্যাদি টপোলজির সমন্বয়ে গঠিত নেটওয়ার্ককে হাইব্রিড টপোলজি ( Hybrid Topology ) বলে।উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ইন্টারনেট এ ধরনের টপোলজি হতে পারে। কারণ ইন্টারনেট হলো বৃহৎ পরিসরের একটি নেটওয়ার্ক যেখানে সব ধরনের টপোলজির মিশ্রণ দেখা যায়। এ টপোলজিতে প্রয়োজন অনুযায়ী নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি করার সুযোগ আছে। কোনো অসুবিধা দেখা দিলে তা সহজেই নির্ণয় করা সম্ভব হয়। কোনো একটি অংশ খারাপ হয়ে গেলে সম্পূর্ণ নেটওয়ার্ক অচল না হয়ে অংশবিশেষ অচল হয়।
  • মেশ টপোলজিঃ যদি কোনো নেটওয়ার্কের ডিভাইস বা কম্পিউটারগুলোর মধ্যে অতিরিক্ত সংযোগ থাকে তাহলে তাকে মেশ টপোলজি (Mesh Topology) বলে।এতে ডেটা কমিউনিকেশনে অনেক বেশি সুবিধা থাকে এবং নেটওয়ার্কের সমস্যা খুব সহজে সমাধান করা যায়।
    রিং টপোলজিতে প্রতিটি কম্পিউটারকে প্রতিটির সাথে অতিরিক্ত নোড (Node) দিয়ে সংযুক্ত করলেই তা মেশ টপোলজিতে রূপান্তরিত হয়।

কম্পিউটার নেটওয়ার্ক এর বিভিন্ন টার্মস ও ডিভাইস

সার্ভার কিঃ সার্ভার হলো এমন একটি শক্তিশালী কম্পিউটার যা নেটওয়ার্কের মধ্যে থাকা অন্য কম্পিউটারগুলোকে বিভিন্ন সেবা দিয়ে থাকে। অর্থাৎ এটি serve করে। সার্ভার (Server) মূলত একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম। অনেক প্রকারের সার্ভার রয়েছে। যেমন – ডেটাবেজ সার্ভার, ফাইল সার্ভার, মেইল সার্ভার, প্রিন্ট সার্ভার, ওয়েব সার্ভার, গেমিং সার্ভার, এ্যাপ্লিকেশন সার্ভার ইত্যাদি।

ক্লায়েন্ট কিঃ ক্লায়েন্ট (Client) হলো সেবা গ্রহণকারী। কম্পিউটার নেটওয়ার্কে ক্লায়েন্ট বলতে এমন হার্ডওয়্যার বা সফটওয়্যারকে বুঝায় যেটি সার্ভার থেকে কোন সেবা গ্রহণ করে। যেমন- আপনি আমাদের ওয়েবসাইটের পোস্টটি কোন মোবাইল বা কম্পিউটার দিয়ে পড়ছেন তাহলে আপনার মোবাইল বা কম্পিউটার হলো ক্লায়েন্ট। আর আমাদের ওয়েবসাইটটি যেখানে আছে সেটি হলো ওয়েব সার্ভার।

মিডিয়া কিঃ কম্পিউটার নেটওয়ার্কে মিডিয়া (Media) হচ্ছে এমন একটি মাধ্যম যার সাহায্যে কম্পিউটারকে জুড়ে দেওয়া হয়। বিদুৎতের তার, কো-এক্সিয়াল তার, অপটিক্যাল ফাইবার ইত্যাদি মিডিয়া হিসাবে কাজ করে। তবে বর্তমানে তার বিহীন ওয়াই-ফাই(Wi-Fi) কম্পিউটার নেটওয়ার্ক এ মিডিয়া হিসাবে ব্যবহৃত হয়।

নেটওয়ার্ক এডাপ্টার কিঃ কোন কম্পিউটারকে নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত করতে হলে নেটওয়ার্ক এডাপ্টার ( Network Adapter) ব্যবহার করতে হয়। নেটওয়ার্ক এডাপ্টারকে নেটওয়ার্ক ইন্টারফেস কার্ড বা কন্ট্রোলার (Network interface controller) বলা হয়। NIC মূলত কম্পিউটারকে মিডিয়ার সাথে কানেক্ট করে ডেটা ট্রান্সমিট করে।

রিসোর্স কিঃ ক্লায়েন্টকে ব্যবহারের জন্য যেসকল তথ্য – উপাত্ত বা সেবা দেওয়া হয় তাকে রিসোর্স বলে। কম্পিউটার দিয়ে আমরা যখন ইন্টারনেট থেকে গেমস খেলার সফটওয়্যার ব্যবহার করি তা হলো রিসোর্স। কেউ যদি তোমার কম্পিউটারে থাকা তথ্য নেটওয়ার্ক এর ব্যবহার করে তখন তোমার কম্পিউটারটি resource হবে। এমনই আমরা যখন ইন্টারনেট থেকে বিভিন্ন আর্টিকেল বা ভিডিও দেখি সেগুলোও রিসোর্স।

ইউজার(User) কেঃ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যে ক্লায়েন্ট সার্ভার থেকে রিসোর্স ব্যবহার করে তাকে ইউজার বা ব্যবহারকারী বলা হয়।

প্রটোকল কিঃ একটি নেটওয়ার্ক কোন নিয়মে, কোন ভাষায় গঠিত হবে এসব নিয়ম-নীতি হলো প্রটোকল। ইন্টারনেট ব্যবহার করার জন্য আমরা ব্যবহার করি http মানে hyper text transfer protocol. প্রতিটি ওয়েবসাইটের নামের শুরুতে এটি দেখা যায়।

হাব কিঃ হাব ( Hub ) হল এমন একটি যন্ত্র যার সাহায্যে তথ্য বা উপাত্ত এক কম্পিউটার থেকে অন্য কম্পিউটারে পাঠানো যায়। হাব বলতে ইন্টারনেট হাব বা নেটওয়ার্ক হাব বুঝালেও বর্তমানে USB হাবও দেখা যায়। সাধারণত অনেকগুলো কম্পিউটার বা প্রিন্টার অথবা অন্যকোন ডিভাইস দিয়ে তারযুক্ত নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হাব ব্যবহার করা হয়। তবে হাব ব্যবহারে সমস্যা হলো এতে কম গতি থাকে এবং সুবিধাও কম। এছাড়াও একটি তথ্য পাঠালে তা নেটওয়ার্ককে থাকা সকল কম্পিউটার পায়। অর্থাৎ হাব নিদিষ্ট ঠিকানায় তথ্য পাঠাতে পারে না।

সুইচ কিঃ

হাবের মতোই সুইচ(Switch) একটি ক্ষুদ্র আইসিটি যন্ত্র। হাবের সাথে সুইচের পার্থক্য হলো সুইচ তার সাথে যুক্ত সকল ডিভাইসকে আলাদাভাবে সনাক্ত করতে পারে কিন্তু হাব সেটা পারে না। সুইচ তার সাথেযুক্ত প্রতিটি ডিভাইসের জন্য আলাদা আলাদা ঠিকানা(MAC= Media Access Control Address) বরাদ্দ করে। ফলে ঠিকানা অনুযায়ী যাকে প্রয়োজন তাকে দ্রুত গতিতে তথ্য প্রেরণ করা যায়। এসব সুবিধার জন্যই সুইচ জনপ্রিয়।

রাউটার কিঃ

নেটওয়ার্ক তৈরির কাজে রাউটার(Router) ব্যবহার করা হয়। রাউটার একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিভাইস যা হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের সমন্বয়ে তৈরি। রাউটার নেটওয়ার্কের মধ্য দিয়ে ডাটা প্যাকেট তার গন্তব্যে কোন পথে যাবে তা নির্ধারণ করে। ডেটা প্যাকেট হলো ডেটার ব্লক বা ডেটার সমষ্টি। রাউটার Data প্যাকেটগুলোকে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সবচেয়ে কম দূরত্বের পাথ(path) ব্যবহার করে।

অন্যান্য ডিভাইসঃ এছাড়াও আরোও অনেক নেটওয়ার্ক ডিভাইস রয়েছে যেমনঃ মডেম, ল্যান কার্ড, রিপিটার, গেটওয়ে ইত্যাদি।

সহজ ভাষায়, কম্পিউটারগুলোর পারস্পরিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে কম্পিউটার নেটওয়ার্ক বলে। নেটওয়ার্ক চার প্রকার। যে লেআউট ব্যবহার করে নেটওয়ার্ক গঠন করা হয় তা হলো টপোলজি। নেটওয়ার্ক তৈরি করতে যে সকল জিনিস লাগে তাই ডিভাইস।