ত্বকের ক্যান্সারের বিভিন্ন লক্ষণ ও এর প্রতিরোধের উপায়

বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের মধ্যে ত্বকের ক্যান্সারে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেশি। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে এ হার বিশ্বব্যাপী ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যার ৪০% থেকে ৫০% বলা হয়েছে। তবে আশার কথা হচ্ছে, ত্বক বিশেষজ্ঞদের মতে প্রায় ৯০% ত্বকের ক্যান্সার শুরুতেই শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসায় সম্পূর্ণ ভালো হওয়া সম্ভব।

ধরন অনুযায়ী ত্বকের ক্যান্সারকে মূলত তিন ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। যথা-

  • বেসাল সেল কার্সিনোমা (BCC)
  • স্কোয়ামাশ সেল কার্সিনোমা (SCC)
  • ম্যালিগন্যান্ট ম্যালানোমা বা ম্যালানোমা।

এই সব ধরনের ক্যান্সারই শুরু হতে পারে ত্বকের যে কোন রকমের পরিবর্তনের মাধ্যমে। ত্বকের সব ধরনের পরিবর্তনই ক্যান্সারের লক্ষণ নয়। তবে ত্বকে তৈরি হওয়া কোন ক্ষত যদি দীর্ঘদিন ধরে ভালো না হয়, ত্বকের উপরের কোন নির্দিষ্ট স্থানের রং যদি হঠাৎ পরিবর্তিত হতে শুরু করে বা শরীরে থাকা তিল বা আঁচিল যদি বড় হতে থাকে বা অপ্রতিসম আকৃতির হয় তাহলে অবহেলা না করে ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

আসুন, সংক্ষিপ্তভাবে দেখে নেয়া যাক কোন ধরনের ত্বকের ক্যান্সারের কি কি লক্ষণ হতে পারে আর এর প্রতিরোধের উপায়গুলো কি কি।

লক্ষণসমূহ:

বেসাল সেল কার্সিনোমা (BCC):

এ ধরনের ক্যান্সার সাধারণত দেহের খোলা অংশসমূহ যেমন মুখ, হাত, পা, গলা, ঘাড় প্রভৃতি স্থানে বেশি হয়ে থাকে। কারণ দেহের এ অঙ্গগুলোতে সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মি সরাসরি লেগে থাকে। এক্ষেত্রে দেহের এসব অঙ্গের কোন স্থানে হঠাৎ অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে। যেমন, কোন স্থানে টিউমারের মত ফুলে ওঠা, খসখসে হয়ে যাওয়া বা চামড়ার রং পরিবর্তন হয়ে যাওয়া। কখনও কখনও এ ধরনের ফুলে ওঠা স্থানে ক্ষতের সৃষ্টি হতে পারে, রক্তপাত হতে পারে। এ অবস্থাকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাধারণ ক্ষত হিসেবে বিবেচনা করে গুরুত্ব দেয়া হয়না। কিন্তু এ ধরনের ক্ষত সহজে ভালো হয়না এবং এটি বেসাল সেল কার্সিনোমা জাতীয় ক্যান্সারের একটি প্রধান লক্ষণ।

এছাড়া বেশিক্ষণ সূর্যরশ্মিতে থাকলে ত্বকে ফুসকুড়ি হতে পারে। এগুলো যদি স্বচ্ছ ফুসকুড়ির মত হয় এবং দীর্ঘসময় ধরে ভালো না হয় বা একবার ভালো হয়ে আবার দেখা দেয় তাহলে এটি স্বাভাবিক অবস্থা নয়।

তবে আশার কথা হচ্ছে এ ধরনের ক্যান্সার অতটা ভয়ঙ্কর নয়। সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে এ জাতীয় ক্যান্সার পরিপূর্ণভাবে নিরাময় করা সম্ভব।

স্কোয়ামাশ সেল কার্সিনোমা (SCC):

এটিও অনেকটা BCC এর মতই দেহের খোলা অঙ্গগুলোতে হয়ে থাকে। এ ধরনের ক্যান্সারে সাধারণত ত্বকে লালচে, ফুলে ওঠা, শক্ত ফোঁড়ার মত দেখা দেয়। এটি বিভিন্ন আকৃতির হতে পারে। এ ধরনের ফোঁড়া থেকে ধীরে ধীরে ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে যাতে রক্তক্ষরণও হতে পারে। সময়মত চিকিৎসা করা না হলে এটি ধীরে ধীরে বড় পিন্ডে পরিণত হতে থাকে।

হাত বা পায়ের আঙ্গুলের নখে কালো দাগের সৃষ্টি হতে পারে।

ত্বক শুষ্ক হয়ে খসখসে ও কাঁটাকাঁটা অনুভূত হতে পারে। ত্বকে অ্যাকজিমা হলেও এ রকমটা হতে পারে। তবে অ্যাকজিমা হলে এতে ঔষধ বা লোশন লাগালে কাজ করে কিন্তু এটি ক্যান্সারের লক্ষণ হলে এতে ঔষধ বা লোশন কাজ করবেনা।

যারা ধূমপান করেন তাদের মুখের ভেতরে অনেক সময় ঘা হয়। এ ধরনের ঘা থেকেও SCC জাতীয় ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

এ ধরনের ক্যান্সার মারাত্মক কিন্তু ম্যালানোমা ক্যান্সারের মত নয়।

ম্যালানোমা:

এ ধরনের ক্যান্সারের মূল লক্ষণ হলো দেহে অপ্রতিসম আকৃতির আঁচিলের উপস্থিতি। এ ধরনের আঁচিলের রং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাদামী থেকে কালো শেডের হয়ে থাকে। তবে কখনও কখনও এগুলো গোলাপী, লাল বা মাংশল রং এর হতে পারে। এগুলোকে অ্যাম্যালানোটিক ম্যালানোমা বলে এবং এগুলো বেশ মারাত্মক। এ ধরনের ক্যান্সারের লক্ষণ হলো দেহে থাকা এ ধরনের আঁচিলে হঠাৎ পরিবর্তন দেখা দেয়া যেমন এর আকার, আকৃতি, রং ইত্যাদিতে পরিবর্তন পরিলক্ষিত হওয়া। শরীরে নতুন নতুন আঁচিল দেখা দেয়াও ভালো লক্ষণ নয়।

আবার শরীরে থাকা সব তিল বা আঁচিলই ম্যালানোমা ক্যান্সারের লক্ষণ প্রকাশ করে তাও নয়। বুঝার সুবিধার্থে অনেক সময় আঁচিলের ধরন বুঝানোর জন্য ‘ABCDE’ সূত্রটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এখানে,

  • Asymmetrical (অপ্রতিসম)
  • (Irregular) Border (অসমান প্রান্ত)
  • Color (Variegated) (নানাবর্ণের রং)
  • Diameter (ব্যাস/আকৃতি) (৬ মিমি. এর চেয়ে বড়- একটি পেন্সিলের পেছনে যে রাবার থাকে তার সমান আকৃতির)
  • Evolving (নতুন গজানো)

দেহে থাকা আঁচিলের সাথে যদি উপরোক্ত বিষয়গুলো মিলে যায় তাহলে এগুলো সাধারণ আঁচিল নয় বলেই ধরে নিতে হবে।

অনেক সময় নতুন গজানো আঁচিলের চারপাশে ব্যাথা, চুলকানি, ক্ষত, লালচে দাগ দেখা দিতে পারে। রক্তপাতও হতে পারে।

এটি সবচেয়ে মারাত্মক অবস্থা। তাই সবসময় এরকম লক্ষণগুলোর ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।

প্রতিরোধের উপায়:

ত্বকের ক্যান্সার প্রতিরোধের সর্বপ্রথম ও সর্বপ্রধান উপায় সম্পর্কে সব বিশেষজ্ঞই যেটি বলে থাকেন তা হলো সরাসরি সূর্যতাপ এড়িয়ে চলা এবং বাইরে বের হবার সময় সানস্ক্রিন লোশন, ক্রিম বা পাউডার ব্যবহার করা। সঠিক মাত্রার SPF (Sun Protection Factor) সমৃদ্ধ সানস্ক্রিন লোশন, ক্রিম বা পাউডার ব্যবহার করাই এটি রোধের সববচেয়ে কার্যকরী উপায়।

সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মি এড়িয়ে চলার জন্য সকাল ৯টা থেকে ৫টা এ সময়টা বাইরে বের হওয়াটা যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতে পারলেই ভালো হয়। আর যদি বের হতেই হয় তাহলে সানস্ক্রিন লাগিয়ে বের হতে হবে এবং প্রতি ২-৩ ঘন্টা অন্তর এটি বার বার লাগাতে হবে।

৯-২৫ বছর বয়সীদেরকে অতিবেগুনী রশ্মি এড়িয়ে চলতে বিশেষজ্ঞরা বিশেষভাবে পরামর্শ দেন। তাছাড়া বাইরে বের হওয়ার সময় বড় হাতার জামা, সানগ্লাস, স্কার্ফ বা হ্যাট বা ছাতা নিয়ে বের হওয়া যায় যাতে করে সরাসরি সূর্যরশ্মি এড়িয়ে চলা যায়।

ধূমপান বা তামাক দ্রব্য সেবনও এ ধরনের ক্যান্সারের জন্য যেহেতু দায়ী তাই এসব অভ্যাস পরিত্যাগ করারও যথাসাধ্য চেষ্টা করা উচিত।

ত্বক সুস্থ রাখার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন ডি গ্রহণ করতে হবে খাবার বা ভিটামিন সাপ্লিমেন্টারির মাধ্যমে ।

শরীরে নতুন নতুন তিল বা আঁচিল দেখা দিলে বা ত্বকের কোন অংশে কোন অস্বাভাবিকতা চোখে পড়লে অবহেলা না করে দ্রুত ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে।

সর্বোপরি, ত্বকের ক্যান্সারের জন্য দায়ী বিভিন্ন কারণ ও এর লক্ষণগুলো জেনে সর্বোচ্চ সচেতনতা বজায় রাখলে এটি অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *