বিশ্বের প্রধান প্রধান ধর্ম পর্ব-৬ ( খ্রিস্টধর্ম )

বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত বিশ্বজনীন এবং বৃহত্তম ধর্মসমূহের মধ্যে খ্রিস্টধর্ম(Christianity) অন্যতম। যীশুখ্রিস্ট প্রবর্তিত মানবপ্রেম ও মুক্তিভিত্তিক বিশ্বজনীন ধর্মাদর্শই খ্রিস্টধর্ম।

খ্রিস্টধর্মের প্রবর্তক

খ্রিস্ট ধর্মের প্রবর্তক যীশুখ্রিস্ট ইসরাঈলের জুদিয়া(Judoea) রাজ্যের বেথেলহেমে পবিত্র আত্মার মাধ্যমে অবিবাহিত অবস্থায় মেরী-র গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। অন্যসূত্রে জানা যায়, দম্পতি যোসেফ ও মেরী এর পুত্র সন্তানটিই যীশুখ্রিস্ট। ইহুদি পুরোহিতগণ যখন জানতে পারেন যীশুখ্রিস্ট ঈশ্বর প্রেরিত এবং ক্রমান্বয়ে তিনি যখন তার ধর্ম প্রচার করেন তখন তারা তাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয় গ্রহণ করেন। রোমান শাসকের সাহায্যে তারা যীশুকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করে। যীশুর মৃতদেহ সমাধিতে রাখা হলে সেখান থেকে তা অদৃশ্য হয়ে যায় এবং তিনি একাধিকবার তার শিষ্যদের সাথে দেখা করে স্বর্গে গমন করেন।

খ্রিস্ট ধর্মের বৈশিষ্ট্য

১. একেশ্বরবাদীঃ খ্রিস্টানরা বিশ্বাস করে, ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয় এবং তিনি সব কিছুর একমাত্র স্রষ্টা। তার কোনো অংশীদার নেই।
২. প্রেমময় ঈশ্বরবাদীঃ খ্রিস্টানদের মতে, ঈশ্বর হচ্ছেন Loving father বা প্রেমময় পিতা কিংবা Kind of God বা পরম দয়ালু প্রভু। আর মানুষ হচ্ছে Loving Child বা ভালোবাসার সন্তান।
৩. মোক্ষবাদীঃ খ্রিস্টানরা মনে করেন, যীশু ইচ্ছে করলে পাপীকে মুক্তি দিতে পারেন। তিনি চিরকালের জন্যে সব পাপীকে ভালোবাসার পথ অনুসরণ করে মোক্ষ লাভের জন্যে নির্দেশ দিয়েছেন।
৪. অমরত্ববাদীঃ খ্রিস্টধর্মে জীবাত্মার অমরত্বে বিশ্বাস পোষণ করা হয়। আত্মার মৃত্যু নেই। স্থানান্তর বা দেহান্তর রয়েছে।
৫. স্বর্গীয় দূতে বিশ্বাসীঃ খ্রিস্টধর্মে স্বর্গীয় দূত বা ফেরেশতায় বিশ্বাস স্থাপন করা হয়। তাঁরা নারী বা পুরুষ নন। তাদের নিদ্রা, খাওয়া বা বিশ্রামের প্রয়োজন হয় না। তাঁরা শুধু সৃষ্টিকর্তার অনুগত্য করে।
৬. শেষ বিচারে বিশ্বাসীঃ শেষ বিচারের দিন মানুষকে আবার তাদের নিজ নিজ কর্মের হিসাব দেয়ার জন্য ডাকা হবে। মানুষ তার স্ব-স্ব কর্মফল হিসাবে সেদিন পুরস্কার বা শাস্তি গ্রহণ করবেন।
৭. শয়তান বা অশুভ শক্তিতে বিশ্বাসীঃ শুভ শক্তির পাশাপাশি পৃথিবীতে যে Evil বা অশুভ শক্তিও রয়েছে খ্রিস্টধর্ম এ বিশ্বাসও পোষণ করে। কারণ পৃথিবীতে যত অকল্যাণ ও পাপ কাজ সাধিত হয় তার সবই হয় অশুভ শক্তির কুপ্রভাবে।
৮. ত্রিত্ববাদীঃ খ্রিস্ট ধর্মমতে ঈশ্বরের তিন রূপ। এগুলো হলো,
ক. God the Father বা পিতা ঈশ্বর।
খ. God the Son বা পুত্র ঈশ্বর এবং
গ. God the Holy spirit বা পবিত্র আত্মা ঈশ্বর।
তবে ঈশ্বরের তিনটি দিক মাত্র, ভিন্ন ভিন্ন ঈশ্বর নয়। বরং এই তিনের সমন্বয়ই সর্বশক্তিমান এক ও অবিনশ্বর ঈশ্বর।
৯. প্রত্যাদিষ্ট ধর্মঃ খ্রিস্টধর্ম ঈশ্বর কর্তৃক প্রেরিত প্রত্যাদেশে বিশ্বাসী। মানুষ নিজ থেকে ঈশ্বর সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে সক্ষম নয় যতক্ষন না ঈশ্বর দয়াপরবশ হয়ে প্রত্যাদেশের মাধ্যমে জ্ঞান না দেন।
১০. অন্যান্য বৈশিষ্ট্যঃ খ্রিস্টধর্ম ঈশ্বরের পিতৃত্বে পূর্ণ বিশ্বাসী। যীশুখ্রিস্টের ত্রাণতত্ত্বে, মধ্যস্থতায় এবং তার অনুসরণে বিশ্বাসী। খ্রিস্টানরা কৃচ্ছতাবাদবিরোধী। ক্রুশ হচ্ছে তাদের ভালোবাসার চিহ্ণ। যে কেউ এই ধর্ম গ্রহণ করতে পারে বলে এটি একটি সর্বজনীন ও বিশ্বজনীন ধর্ম হিসাবে স্বীকৃত।

ধর্মগ্রন্থ

বাইবেল খ্রিস্টধর্মের প্রধান ধর্মগ্রন্থ। এর দুটি প্রধান অংশ। এগুলো হলো,
ক) Old Testament বা পূর্বখণ্ড এবং
খ) New Testament বা অন্তঃখণ্ড।

শাখা-প্রশাখা

বর্তমান বিশ্বে খ্রিস্টিয় ধর্মসংঘগুলো প্রধানত তিনটি ভাগে বিভক্ত।যেমন-
১. প্রাচ্য ধর্মসংঘ;
২. রোমান ক্যাথলিক এবং
৩. প্রোটেস্ট্যান্ট।

ইসলামে খ্রিস্টধর্ম প্রসঙ্গ

খ্রিস্টধর্মের প্রবর্তক যীশুখ্রিস্ট ইসলাম ধর্মে হযরত ঈসা (আ) হিসাবে খ্যাত। পবিত্র কুরআনে সূরা আলে ইমরান, সূরা মারইয়াম সহ অনেক সূরাতে এ সম্পর্কিত বর্ণনা পাওয়া যায়। হযরত যাকারিয়া (আ) – এর সমসাময়িককালে ফিলিস্তিনে ইমরান ও হান্না নামে এক নিঃসন্তান দম্পতি ছিলেন। ইমরানের স্ত্রী আল্লাহর নিকট সন্তান কামনা করায় আল্লাহ তার গর্ভে একটি কন্যা সন্তান দেন। জন্মের পর তার নাম রাখা হয় মারইয়াম এবং হযরত যাকারিয়া (আ) এর তত্ত্বাবধানে তাকে বায়তুল মুকাদ্দাসে প্রেরণ করা হয়।সেখানে তিনি নৈতিক শিক্ষায় বড় হতে থাকেন। বায়তুল মুকাদ্দাসে ইবাদতের সময় ফেরেশতাগণ মারইয়াম (আ) -কে ঈসা (আ) -এর জন্মের সুসংবাদ দেন। “যখন ফেরেশতাগণ বলেছিলেন, ‘হে মারইয়াম! নিশ্চয় আল্লাহ আপনাকে তাঁর পক্ষ থেকে একটি সন্তানের সুসংবাদ দিচ্ছেন। তার নাম হবে মসীহ ঈসা ইবনে মারইয়াম। তিনি দুনিয়া ও অখিরাতে সম্মানিত হবেন এবং আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্তদের অন্যতম হবেন। তিনি দোলনা থাকা অবস্থায় এবং পরিণত বয়সে মানুষের সাথে কথা বলবেন এবং তিনি হবেন সৎকর্মশীলদের অন্যতম।’ মারইয়াম বললেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! কীভাবে আমার সন্তান হবে? অথচ কোনো পুরুষ আমাকে স্পর্শ করেনি!’ আল্লাহ বললেন, ‘এভাবেই আল্লাহ যা ইচ্ছা তা সৃষ্টি করেন। তিনি যখন কোনো কিছু করার ইচ্ছা করেন তখন কেবল বলেন হও, আর তা হয়ে যায়।” (সূরা আলে ইমরানঃ ৪৫-৪৭)
খ্রিস্টপূর্ব ৩৩ সনে হযরত ঈসা (আ) এর জন্ম হয়। যখন লোকেরা মারইয়াম এর নামে নানা কথা বলতে লাগলো তখন শিশু ঈসা (আ) কোলে থাকা অবস্থায় কথা বললেন এবং তার মায়ের পবিত্রতার ঘোষনা দেন। হযরত ঈসা (আ) আল্লাহ মনোনীত নবী ও রাসূল ছিলেন। তিনি যখন সকলকে ইসলামের দাওয়াত প্রদান করতে লাগলেন তখন ইহুদি ধর্মযাজকগণ রোমান শাসকের সহায়তায় তাকে একটি ঘরের মধ্যে অবরুদ্ধ করে এবং তায়তালানুস নামক এক ব্যক্তিকে ঘরের ভিতরে তাঁকে হত্যার জন্য প্রেরণ করে। মহান আল্লাহ ঈসা (আ) কে আসমানে তুলে নেন এবং তায়তালানুস এর চেহারা ঈসা (আ) এর মত করে দেন। সে যখন বের হয়ে আসে লোকেরা তাকে হত্যা করে। ফলে তাদের মধ্যে সংশয় সৃষ্টি হয়। যাকে হত্যা করা হলো সে যদি ঈসা হয় তবে তায়তালানুস কোথায় আর হত্যাকৃত যদি তায়তালানুস হয় তবে ঈসা কোথায়?
ঈসা (আ) পৃথিবীতে ৩৩ বছর ছিলেন এবং কিয়ামতের পূর্বে তিনি আবার আসবেন।

হযরত ঈসা (আ) -এর মুজিযা

১. অলৌকিকভাবে পিতা ছাড়া জন্মগ্রহণ।
২. জন্মের পর পরই নিজের এবং মায়ের সমর্থনে লোকদের সাথে কথা বলা।
৩. কাদামাটি দিয়ে তৈরি পাখির মধ্যে আল্লাহর নাম নিয়ে ফুঁ দিলে সেটি জীবিত হওয়া।
৪. আল্লাহর অনুগ্রহে হাতের ছোঁয়ায় জন্মান্ধ লোকদের দৃষ্টিশক্তি দান করা, কুষ্ঠ রোগের পূর্ণ নিরাময় দান।
৫. মানুষ ঘর থেকে যা খেয়ে আসে তা বলে দেওয়া ও অনুসারীদের জন্য জান্নাতী খাবার নিয়ে আসা এবং
৬. ইহুদি-পুরোহিত-রাজশক্তির ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়ে তাঁকে জীবিত অবস্থায় আকাশে তুলে নেওয়া।
ইসলামে আল্লাহর নবী ও রাসূল হিসাবে হযরত ঈসা (আ) -এর স্বীকৃতি সবসময়ই রয়েছে।

তথ্যসূত্র-

বইঃ বিশ্বের প্রধান প্রধান ধর্ম

লেখকঃ ড. মোঃ ইব্রাহীম খলিল

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *