সার্ভিস

সেবা কি? সেবার বৈশিষ্ট্য এবং গুরুত্ব

বর্তমানে বাংলাদেশে সেবার চাহিদা ( Service Demand ) দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আজ থেকে দশ বছর আগে কেউ চিন্তা করেনি Food Panda -র মাধ্যমে তার পছন্দের খাবার মোবাইলের ক্লিকে ঘরে চলে আসবে। অতীতে কেউ খুব সহজে টাকা পাঠানোর জন্য bkash মোবাইল ব্যাংকিং সেবা পায়নি। আপনি কোথাও যাবেন গাড়ি প্রয়োজন, ফোনের ক্লিকে Ubar / Pathao গাড়ি আপনার ঘরের সামনে চলে আসে। এসবগুলো সেবা বা সার্ভিসের উদাহরণ।

সেবা কাকে বলে? সেবা বাজারজাতকরণ কি?

সেবা হচ্ছে এমন কিছু কাজ, উপকারিতা বা সুবিধা যা মানুষের প্রয়োজন বা অভাব পূরণ করে, বিক্রয়ের জন্য বাজারে উপস্থাপন করা হয় তবে এটি অদৃশ্যমান ও অস্পর্শনীয়। Philip Kotler and Gary Armstrong-এর মতে, “সেবা হচ্ছে কোন কাজ বা সুবিধা যা একপক্ষ অন্যপক্ষকে প্রদান করতে পারে, যা অবশ্যই অস্পর্শনীয় এবং যাতে মালিকানার কোনো পরিবর্তন ঘটে না”। যেমন: স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস, ডাক বিভাগ, হোটেল, বিউটি পার্লার, সেলুন, ব্যাংক, পরিবহন, কুরিয়ার সার্ভিস ইত্যাদি।

সেবা বাজারজাতকরণ হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে সেবার পার্থক্যমূলক বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরা হয়, চুক্তি ও কার্যসম্পাদানের মাধ্যমে সেবার অদৃশ্য সুবিধা বিশেষভাবে বর্ণনা করা হয়। এক কথায়, সেবাকে যখন বাজারজাতকরণ কার্যক্রম দ্বারা ক্রোতাদের নিকট উপস্থাপন করা হয় তাকে সেবা বাজারজাতকরণ বা সার্ভিস মার্কেটিং বলে। সেবা বাজারজাতকরণ ( Service Marketing ) মূলত এমন অদৃশ্য কাজ, সুবিধা ও তৃপ্তি নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে যা গ্রহীতাদের প্রয়োজন পূরণ করে।

কিভাবে ক্রেতাকে সর্বোত্তম সেবা দেওয়া যায়?

ক্রেতাকে Best Service দিতে হলে অনেকগুলো বিষয় মাথায় রাখতে হয়। যা বিশ্লেষণ করা সময়সাপেক্ষ। ছোট একটা উদাহরণ দেখি- আমরা নিশ্চয়ই বাসে করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গিয়ে থাকি। এখানে বাস আমাদের যাতায়াতের সেবা দিয়ে থাকে আর আমরা যাত্রী হিসাবে তা গ্রহণ করি। এখন বাস মালিক যদি সিদ্ধান্ত নেয় যাত্রীদেরকে ভালো সার্ভিস দিবে এজন্য তাদের অবশ্যই যাত্রীদের সন্তুষ্ট করতে হবে।এজন্য বাস মালিককে চিন্তা করতে হবে:- বাসের টিকেট পাওয়া সহজলভ্য কিনা, অনলাইনে টিকেট কেনার সুবিধা আছে কিনা, ভাড়া যাত্রীদের কাছে বেশী মনে হয় নাকি, ভাড়া পরিশোধের সহজ উপায় আছে কিনা, বাস শিডিউল মেনে চলে কিনা, যাত্রীদের উঠা-নামার গেট প্রশস্ত কিনা, ভেতরে কতটুকু পরিষ্কার, সিটগুলো কি আরামদায়ক, ড্রাইভার দক্ষ কিনা, হেলপার-সুপারভাইজার যাত্রীদের সাথে কেমন আচরণ করে, বাসটি যান্ত্রীকভাবে ত্রুটি মুক্ত কিনা, অপ্রত্যাশিত সমস্যা হলে সামাধানের জন্য কতটুকু প্রস্তুত ইত্যাদি বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন থাকলে যাত্রীকে সর্বোত্তম সেবা দেওয়া যাবে।

সেবার বৈশিষ্ট্য কয়টি ও কি কি

সেবার বৈশিষ্ট্য সাধারণত ৪ টি। যথাঃ অদৃশ্যমানতা, অবিচ্ছেদ্যতা, পরিবর্তনশীলতা, পঁচনশীলতা। সেবার বৈশিষ্ট্যগুলো সেবাকে পণ্য থেকে পৃথক করেছে। সেবা গ্রহণে ক্রেতার অংশগ্রহণ থাকে। তবে গ্রহীতা সেবার মালিকানা অর্জন করতে পারে না।

  • অদৃশ্যমানতা (Intangibility): পণ্যের মতো সেবাকে ক্রয়ের আগে সেবাকে চোখে দেখা , স্বাদ নেয়া, অনুভব করা, শোনা বা গন্ধ নেয়া যায় না। তাই সেবাকে অদৃশ্যমান বলা হয়। যেমন: আপনি সেলুনে বা পার্লারে চুল কাটতে গেলেন। চুল কাটার আগে আপনি বুঝতে পারবেন না এই সেলুনে কিভাবে চুল কাটে। এখানে নাপিতের সেবাটা অদৃশ্যমান থাকে।
  • অবিচ্ছেদ্যতা (Inseparability): সেবাকে সেবা প্রদানকারী থেকে আলাদা করা যায় না। একজনের সেবা অন্যজনের মাধ্যমে বিক্রয় বা প্রদান করা যায় না। সেবা প্রদানের সাথে সাথে সেবাকে ভোগ বা এর উপযোগ গ্রহণ করতে হয়। যেমন: একজন শিক্ষক যেভাবে পড়ান তা তিনি ছাড়া অন্য কেউ তার মত করে পড়াতে পারবেন না। একইভাবে দাঁতের ডাক্তার, সঙ্গীত শিল্পী, নৃত্য শিল্পী, ওকালতি ইত্যাদি পেশার ব্যক্তিদের সেবা তাদের থেকে আলাদা করা যায় না।
  • পরিবর্তনশীলতা (Variability): কে, কখন, কোথায় এবং কিভাবে সেবা প্রদান করে তার উপর সেবার মান নির্ভর করে। একারণে সেবার মান সব সময় পরিবর্তনশীল হয়। যেমন: একজন অভিজ্ঞ ডাক্তার একজন কম অভিজ্ঞ ডাক্তারের চেয়ে অধিক দক্ষতার সাথে অপারেশন করতে পারে। যার কারণে অভিজ্ঞ ডাক্তারের সেবার মান উন্নত হয়। আবার বিভিন্ন অপারেশনের সময় অভিজ্ঞ ডাক্তারের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে সেবার মানের পার্থক্য হয়।
  • পঁচনশীলতা (Perishability): সেবাকে পরবর্তীতে বিক্রয় বা ব্যবহারের জন্য সংরক্ষণ করা যায় না। নির্দিষ্ট সময়ে সেবা গ্রহণ না করলে তা চিরদিনের জন্য পরিত্যক্ত হয়ে যায়। যেমন: একটি বাসের যদি কয়েকটি টিকেট বিক্রি না হয় আর এই খালি আসনগুলো নিয়ে বাস যদি গন্তব্য চলে যায় তাহলে খালি আসনগুলো হলো পঁচনশীল। কেননা ঐ সময়ের দেওয়া যাত্রী সেবা আর কেউ গ্রহণ করতে পারবে না। একইভাবে হোটেলের রুম খালি থাকলে, কোন ব্যক্তি কর্মে নিয়োজিত না থাকলে, কোন স্থান ধারণ ক্ষমতার অর্ধেক ব্যবহার করা হলে ইত্যাদি সেবার পঁচনশীলতা প্রকাশ করে।

সেবার গুরুত্ব

সেবা বাজারজাতকরণের গুরুত্ব দিন দিন বেড়ে চলছে। এর মাধ্যমে নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হচ্ছে এবং জীবন ধাঁচের পরিবর্তন হচ্ছে। যার কারণে হোটেল, মোটেল, শিশুপার্ক জনপ্রিয় হচ্ছে। প্রযুক্তির উপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এজন্যে সেবামূলক পণ্য চাহিদা বাড়ছে। মাথাপিছু আয় ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি হচ্ছে। মানুষের অবসর সময় বৃদ্ধি পাচ্ছে তাই বিনোদন কেন্দ্রের গুরুত্ব বাড়ছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে কোচিং সেন্টার, বিউটি পার্লার, জিমনেসিয়াম ইত্যাদি সেবা প্রতিষ্ঠানের কদর বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বপরি বিশ্বায়নের কারণে সেবা খাতের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। এজন্যে বলা যায় সেবার গুরুত্ব অপরিসীম।

Leave a Comment

Your email address will not be published.