বাংলাদেশের আইনে তালাক বা ডিভোর্সের নিয়ম

শুধু মুখে তিন তালাক উচ্চারণ করলেই তালাক কার্যকর হয় না। আবার লিখিতভাবে তালাক দিলেও সাথে সাথে তা কার্যকর হবে না। আইনের বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করার পর তালাক কার্যকর হবে। তালাকের প্রকারভেদঃ-

১. স্বামী কর্তৃক তালাকঃ তালাক দেওয়ার অধিকার বা ক্ষমতা স্বামীর সবচেয়ে বেশি। কোন কারন ব্যতীত স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে।

২. স্ত্রী কর্তৃক তালাকঃ তালাক দেওয়ার অধিকার বা ক্ষমতা স্ত্রীর কম। আইনে উল্লেখিত কারণ ব্যতীত স্ত্রী তার স্বামীকে তালাক দিতে পারবে না।তবে কাবিন নামার ১৮ নং কলামে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে বিয়ে বিচ্ছেদের ক্ষমতা দেওয়া থাকলে (তালাক-ই-তৌফিজ) স্ত্রী তালাক দিতে পারবে।

৩. পারস্পারিক সম্মতিতে তালাকঃ

ক) খুলা – স্ত্রী তার স্বামীকে যেকোন কিছুর বিনিময়ে তালাক দেওয়ার জন্য রাজি করাবেন।

খ) মুবারত – স্বামী স্ত্রী উভয়ের পারস্পারিক সম্মতিতে তালাকের সিদ্ধান্ত নেওয়া।

৪.  আদালত কর্তৃক বিচ্ছেদঃ আদালতে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করে  ডিভোর্স নেওয়া।

কিভাবে স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক দিবেন

১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৭(১) ধারায় বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তালাক দিতে চাইলে যেকোন পদ্ধতির তালাক ঘোষনার পর যথাশীঘ্র সম্ভব তালাকের নোটিশ স্থানীয় ইউনিয়ন পরিশোধ/পৌরসভা/সিটি কর্পোরেশনের চেয়ারম্যানকে পাঠাতে হবে এবং উক্ত নোটিশের একটি অনুলিপি(নকল) স্ত্রীকে পাঠাতে হবে।

একই আইনের ৭(২) ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোন ব্যক্তি নোটিশ প্রদানের এ বিধান লংঘন করেন তবে তিনি এক বছর বিনাশ্রম কারাদন্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় প্রকার দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন। তবে স্বামী যদি নোটিশ প্রদান না করে তাহলে শাস্তি পাবে ঠিকই কিন্তু তালাক বাতিল হবে না। 

৭(৪) ধারা অনুযায়ী, নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে চেয়ারম্যান সংশিষ্ট পক্ষ দ্বয়ের মধ্যে পুনর্মিলন ঘটানোর উদ্দেশ্যে একটি সালিশী পরিষদ গঠন করবেন।সালিশী পরিষদ যদি সমঝোতা করতে ব্যর্থ হয় এবং স্বামী যদি ৯০ দিনের মধ্যে তালাক প্রত্যাহার না করে তবে ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হবে। এই ৯০ দিন স্বামী তার স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য থাকবে।

৭(৩) ধারা মতে,  চেয়ারম্যানের কাছে নোটিশ প্রদানের তারিখ হতে ৯০ দিন অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত তালাক কার্যকর হবে না। কিন্তু তালাক ঘোষণার সময় স্ত্রী যদি গর্ভবতী থাকে তাহলে ৭(৫) অনুযায়ী গর্ভাবস্থা অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত তালাক কার্যকর হবে না। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার ৯০ দিন পর তা কার্যকর হবে।

মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯৭৪ এর ৬ ধারা মতে বিয়ের তালাক ও রেজিষ্ট্রি করতে হয়। কাজী নির্ধারিত ফি নিয়ে তালাক রেজিষ্ট্রি করবেন এবং ফি ব্যতীত প্রত্যয়ন কপি প্রদান করবেন।

কি কি কারণে স্ত্রী তার স্বামীকে তালাক দিতে পারবেন

১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইনে অত্যান্ত সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যেসব কারণে স্ত্রী আদালতে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারবেন-

১. চার বছর পর্যন্ত স্বামী নিরুদ্দেশ থাকলে।

২. দুই বছর স্বামী স্ত্রীর খোরপোষ দিতে ব্যর্থ হলে।

৩. স্বামীর সাত বছর কিংবা তার চেয়ে বেশী কারাদণ্ড হলে।

৪. স্বামী কোন যুক্তি সংগত কারণ ব্যতীত তিন বছর যাবৎ দাম্পত্য দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে।

৫. বিয়ের সময় পুরষত্বহীন থাকলে এবং তা মামলা দায় করা পর্যন্ত বজায় থাকলে।

৬. স্বামী দুই বছর ধরে পাগল থাকলে অথবা কুষ্ঠ ব্যধিতে বা মারাত্মক যৌন ব্যধিতে আক্রান্ত থাকলে।

৭. বিবাহ অস্বীকার করলে। কোন মেয়ের বাবা বা অভিবাবক যদি ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগে মেয়ের বিয়ে দেন, তাহলে মেয়েটি ১৯ বছর হওয়ার আগে বিয়ে অস্বীকার করে বিয়ে ভেঙ্গে দিতে পারে, তবে যদি মেয়েটির স্বামীর সঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্ক(সহবাস) স্থাপিত না হয়ে থাকে তখনি কোন বিয়ে অস্বীকার করে আদালতে বিচ্ছেদের ডিক্রি চাইতে পারে।

৮. স্বামী ১৯৬১ সনের মুসলিম পারিবারিক আইনের বিধান লংঘন করে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করলে।

৯. স্বামী নিষ্ঠুর ব্যবহার করলে।

উপরের যেকোন এক বা একাধিক কারণে স্ত্রী আদালতে বিয়ে বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারে। স্ত্রী আভিযোগ প্রমাণ করতে পারলে আদালত বিয়ে বিচ্ছেদের ডিক্রি দিতে পারে। ডিক্রি প্রদানের সাত দিনের মধ্যে একটি সত্যায়িত কপি আদালতের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানের কাছে পাঠাবে। চেয়ারম্যান নোটিশকে তালাক সংক্রান্ত নোটিশ হিসাবে গণ্য করে আইনানুযায়ী পদক্ষেপ নিবে এবং চেয়ারম্যান যেদিন নোটিশ পাবে সেদিন থেকে ঠিক নব্বই দিন পর তালাক চূড়ান্তভাবে কার্যকর হবে।

কখন দ্বিতীয় বা বহুবিবাহ করা যাবে-

ক. বর্তমান স্ত্রীর বন্ধ্যাত্ব
খ. দৈহিক দূর্বলতা
গ. দাম্পত্য সম্পর্কের জন্য দৈহিক অনুপযুক্ততা
ঘ. দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য প্রদত্ত আদালতের কোন ডিক্রিকে ইচ্ছাকৃতভাবে এড়ানো
ঙ. বর্তমান স্ত্রীর মানসিক অসুস্থতা ইত্যাদি

তবে এক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি থাকলে এবং একটি সালিশী পরিষদের মাধ্যমে স্থানীয় চেয়ারম্যান যদি অনুমতি পত্র দেয় তাহলে দ্বিতীয় বিবাহ করতে আইনত কোন বাধা থাকে না।

স্বামীর আদালত স্বীকৃত নিষ্ঠুর ব্যবহার সমূহ-

ক. অভ্যাসগতভাবে স্ত্রীকে আঘাত করলে বা নিষ্ঠুর আচরণ করলে, উক্ত আচরণ দৈহিক পীড়নের পর্যায় না পড়লেও তার জীবন শোচনীয় করে তুলছে এমন হলে।

খ. স্বামী খারাপ মেয়ের সাথে জীবন যাপন করলে।

গ. স্ত্রীকে অনৈতিক জীবন যাপনে বাধ্য করলে।

ঘ. স্ত্রীর সম্পত্তি নষ্ট করলে।

ঙ. স্ত্রীকে ধর্ম পালনে বাধা দিলে।

চ. একাধিক স্ত্রী থাকলে সকলের সাথে সমান ব্যবহার না করলে।

ছ. এছাড়া অন্য যেকোন কারণে( যে সকল কারণে মুসলিম আইনে বিয়ের চুক্তি ভঙ্গ হয়) ।

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তালাক হলে সন্তান কার কাছে থাকবে

ছেলে সন্তানের ক্ষেত্রে সাত বছর এবং মেয়ে সন্তানের ক্ষেত্রে সাবালিকা হওয়া পর্যন্ত তার মায়ের কাছে থাকবে।এরপর থেকে তার বাবার কাছে থাকবে।তবে যার কাছে থাকলে সন্তানের কল্যাণ হবে আদালত তার কাছে থাকার অনুমতি দিতে পারেন।

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যদি তালাকের প্রয়োজন দেখা দেয় তবে অভিজ্ঞ উকিলের পরামর্শ গ্রহন করাই যুক্তিযুক্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *