বিশ্বের প্রধান প্রধান ধর্ম পর্ব-৭ ( ইসলাম )

বিশ্বের প্রধান ধর্ম সমূহের মধ্যে ইসলাম অন্যতম। ইসলাম শব্দটি আরবি শব্দ। এর অর্থ শান্তি। আরবি ভাষায় ইসলাম বলতে বুঝায় আনুগত্য ও বাধ্যতা। ইসলাম ধর্মের অনুসারিদের বলা হয় মুসলিম।

ইসলাম ধর্মের মৌলিক মূলনীতিসমূহ

ইসলামের মৌলভিত্তি হলো পাঁচটি। এগুলো হলো-১.ঈমান; ২. সালাত; ৩. যাকাত; ৪. সাওম এবং ৫. হজ

প্রথম মৌলভিত্তিঃ ঈমান

ঈমান অর্থ হলো আনুগত্য করা, স্বীকৃতি দেয়া, বিশ্বাস করা। ঈমানের বিষয় হলো পাঁচটি।যথা-
১. আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা;
২. আল্লাহর দূত মালাইকা বা ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান আনা;
৩. আল্লাহর কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান আনা;
৪. আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত নবী-রাসূলগণের সত্যতায় ঈমান আনা এবং
৫. আখিরাতে ঈমান আনা।

দ্বিতীয় মৌল ভিত্তিঃ সালাত

সালাত অর্থ সান্নিধ্য, নত হওয়া, বিনয়ী হয়ে সম্পর্ক স্থাপন করা। ফারসি ভাষায় একে ‘নামায’ বলে যা আমরা বাংলায় ব্যবহার করি। প্রতিদিন পাঁচবার আল্লাহ নির্ধারিত ও রাসূলুল্লাহ (স) নির্দেশিত বিশেষ যে ইবাদত সম্পাদন করা হয় তাকে সালাত বলে। প্রতিদিনের পাঁচ ওয়াক্ত সালাত হলো ফজর, যোহর, আছর, মাগরিব ও এশা।
ইসলামে সালাত একটি ফরয বা অবশ্যকরণীয় ইবাদত। পবিত্র কুরআনে অসংখ্য স্থানে আল্লাহ তাআলা সালাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন।

তৃতীয় মৌল ভিত্তিঃ যাকাত

যাকাত একটি অর্থনৈতিক ইবাদত এবং ইসলামী অর্থব্যবস্থার মূলভিত্তি। নিসাব পরিমাণ সম্পদ অর্থাৎ ৭.৫ তোলা সোনা বা ৫২.৫ তোলা রূপা কিংবা এর যে কোনো একটির সমপরিমাণ অর্থ যদি কোনো মুসলিম ব্যক্তির মালিকানায় পূর্ণ এক বছর থাকে এবং তা যদি তার প্রয়োজনের অতিরিক্তি হয় তাহলে শরীআতের নির্ধারণ অনুযায়ী সে সম্পদ থেকে ২.৫% অর্থ নির্দিষ্ট আটটি খাতে কিংবা কোনো একটি খাতে দান করতে হবে।

চতুর্থ মৌল ভিত্তিঃ সাওম

সাওম অর্থ বিরত থাকা বা আত্মসংযম করা। এর ফার্সি ভাষার শব্দ ‘রোজা’। রমজান মাসে সাওমের নিয়তে সুবহি সাদিক হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও যৌনক্রিয়া থেকে বিরত থাকাই সাওম। প্রাপ্ত বয়স্ক ও সুস্থ প্রতিজন মুসলিমের ওপর সাওম ফরয।

পঞ্চম মৌল ভিত্তিঃ হজ

প্রাপ্তবয়স্ক এবং আর্থিক ও দৈহিকভাবে সক্ষম মুসলিমের জন্য জীবনে মাত্র একবার যিলকদ ও যিলহজ মাসে ইহরামের সাথে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ ও আরাফাতে অবস্থানের মাধ্যমে একটি ফরয কাজ সম্পন্ন করাই হজ।

ইসলামের মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ

ইসলাম মানব জীবনের পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। পার্থিব, অপার্থিব, জাগতিক, লৌকিক, পারলৌকিক, আধ্যাত্মিক ও আত্মিক জীবনের সকল সমস্যার সুষ্ঠ সমাধান করে মানুষকে তার পূর্ণ মহিমায় উদ্ভাসিত করে তোলাই ইসলামের লক্ষ্য। ইসলামের বৈশিষ্ট্যগুলো হলো-
১. মানব প্রকৃতি সহজাতঃ আল্লাহ তাআলা মানুষ সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষের স্বভাব প্রকৃতি, কাজ করার লক্ষ্য, সহ্য ক্ষমতা, প্রবণতা, মানসিকতা এবং বাস্তবতার ভিত্তিতে গৃহীত বিধিব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখেন।
২. বিশ্বজনীন ও সর্বকালীনঃ ইসলাম পৃথিবীর বিশেষ কোনো জাতি, অঞ্চল, গোত্র নির্দিষ্ট কোনো সময়ের মতাদর্শ নয়। এ হলো এমন একটি জীবনব্যবস্থা যা গ্রহণ করার অধিকার পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের এবং কিয়ামতের পূর্ব পর্যন্ত কোনো রকম সংশোধনী ছাড়াই এটি অবিকলভাবে কার্যকর থাকবে।
৩. একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থাঃ একমাত্র ইসলামই মানুষের জীবনের সকল দিক সম্পর্কে বিস্তারিত, বিজ্ঞানসম্মত ও যৌক্তিক আদর্শ উপস্থাপন করেছে। এ জন্যে ইসলামই একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা।
৪. সমন্বিত জীবন ব্যবস্থাঃ মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রের সকল সমস্যার সমাধান দিয়েছে ইসলাম। মোটকথা মানুষের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের জন্য একমাত্র ইসলাম -ই দিয়েছে সঠিক পথের সন্ধান।
৫. জীবনদর্শন, জীবন বিধান ও ব্যবস্থাঃ জীবন দর্শন, জীবন বিধান এবং জীবন ব্যবস্থা হিসাবে একমাত্র ইসলামই দিয়েছে মানুষের জন্ম হতে মৃত্যু পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধান। ইসলামই মানুষকে চলার পথের সঠিক সন্ধান দিয়েছে।
৬. ব্যাপক ভিত্তিকঃ মানুষের জীবনের কোনো ক্ষুদ্র দিকও ইসলামের আওতার বাইরে কল্পনা করা যায় না। ইসলাম যেমন রাষ্ট্র পরিচালনার আদর্শ পেশ করেছে সাথে সাথে একজন মানুষ কীভাবে পায়খানা-প্রস্রাব করিবে সে সম্পর্কেও হুকুম প্রদান করেছে।
৭. ভারসাম্য পূর্ণঃ কেউ হয়তো দুনিয়া নিয়ে আছে, কেউ আধ্যাত্মিক জগত, কেউ আর্থিক কিংবা জৈবিক সমস্যা নিয়ে বিধান প্রণয়ন করেছে। কিন্তু ইসলাম জীবনের কোনো আংশিক সমস্যাকে সমস্যা হিসাবে না দেখে গোটা জীবনের মধ্যে একটি অনিবার্য ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত করার আদর্শ পেশ করেছে।
৮. অন্যান্য বৈশিষ্ট্যঃ ইসলামি মুক্তির একমাত্র পথ। আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনের হুকুম। ইসলাম মানবতার একমাত্র ভবিষ্যৎ। মানুষ ও প্রকৃতির সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা কারী। ইসলাম মানুষের মর্যাদা সংরক্ষক ও সাম্যবাদী। শান্তি, প্রগতি ও পূর্ণতার নিশ্চয়তা বিধায়ক একমাত্র ইসলাম।

ইসলামী শরীয়তের উৎস

ইসলামী শরীয়তের চারটি উৎসহের মধ্যে মূল উৎস দুটি। যথাঃ-
১. আল-কুরআন
২. আল-হাদিস
এই দুটির ওপর ভিত্তি করে ইসলামের যাবতীয় হুকুম আহকাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

আল-কুরআনের পরিচয়

কুরআন মাজীদ আল্লাহর বাণী। যা লাওহি মাহফূযে অনন্তকাল ধরে সুরক্ষিত থাকার পর জিব্রাঈল (আ) – এর মাধ্যমে নবুয়তের দীর্ঘ তেইশ বছর ধরে মহানবী (স) -এর নিকট অবতীর্ণ হয়েছে, যা সন্দেহাতীত পদ্ধতিতে আজ পর্যন্ত অবিকল ও অবিকৃত অবস্থায় সুরক্ষিত হয়ে আসছে এবং যার শব্দ, অর্থ, মর্ম, উপস্থাপনা, বিন্যাস- সবই আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “এটা সে কিতাব; এতে কোনো সন্দেহ নেই। মুত্তাকীদের জন্যে এটা পথনির্দেশ।” (আল-কুরআন- ২ : ২)
ব্যক্তি,পরিবার, সমাজ, জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনৈতিক, রাষ্ট্রিয়, অর্থনৈতিক, সামরিক, নৈতিক, আধ্যাত্মিক, পরকালীন, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক জীবনের সকল শিক্ষা আল কুরআনে রয়েছে।

হাদিসের পরিচয়

হাদীস শব্দের সাধারণ অর্থ বাণী বা কথা। রাসূলুল্লাহ (স) -এর কথা, কাজ ও মৌন অনুমোদনকে হাদীস বলা হয়। বস্তুত আল কুরআনের শিক্ষা সমূহকে বাস্তব জীবনে আনুসরণ করার পদ্ধতি রয়েছে আল হাদিসে।

ইসলামে একজন মুসলিমের দায়িত্ব ও কর্তব্য

১. সালাত কায়িম করা।
২. যাকাত আদায় করা।
৩. সাওম পালন করা।
৪. হজ পালন করা।
৫. জীবনের সকল পর্যায় ইসলাম অনুশীলন করা।
৬. ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা।
৭. আল্লাহকে ভয় করা, তার ইবাদত করা ও তার সাথে কাউকে শরীক না করা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করা।
৮. পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান ও আত্মীয় স্বজনের হক আদায় করা।
৯. সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, সম্পদ আত্মসাৎ না করা, হত্যা না করা, চুরি প্রতিরোধ করা, ব্যাভিচার না করা এবং ব্যাভিচার প্রতিরোধ করা।
১০. ইয়াতীম, অভাবগ্রস্থ, প্রতিবেশী, বন্ধু-সাথী, মুসাফির ও দাস-দাসীদের সাথে সদাচরণ করা।
১১. হালাল উপার্জন করা, অপচয়-অপব্যয় না করা, দরিদ্রদের দান করা,দান করতে না পারলেও ভালো ব্যবহার করা ও সুদ বর্জন করা।
এছাড়াও ইসলামী শরীয়তে বর্ণিত সকল হুকুম আহকাম মেনে চলা একজন মুসলিমের আবশ্যই দায়িত্ব ও কর্তব্য। মূলত ইসলামের এই সকল শিক্ষার জন্যই এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা এবং বিশ্বব্যাপী দিন দিন এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে।


তথ্যসূত্রঃ
বইঃ বিশ্বের প্রধান প্রধান ধর্ম
লেখকঃ ড. মোঃ ইব্রাহীম খলিল

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *